লিউকিমিয়া

leukemia-treatment

লিউকিমিয়া বা লিউকেমিয়া (ইংরেজি: Leukemia বা leukaemia) রক্ত বা অস্থিমজ্জার ক্যান্সার। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এর প্রধান লক্ষণ রক্তকণিকার, সাধারণত শ্বেত রক্তকণিকার অস্বাভাবিক সংখ্যাবৃদ্ধি। রোগটির নামই হয়েছে এর থেকে- লিউক~ অর্থাৎ সাদা, হিমো~ অর্থাৎ রক্ত। রক্তে ভ্রাম্যমান এই শ্বেত রক্ত কণিকাগুলি অপরিণত ও অকর্মণ্য। এবং রক্ত উৎপাদনকারী অস্থিমজ্জার মধ্যে এদের সংখ্যাধিক্যের ফলে স্থানাভাবে স্বাভাবিক রক্তকণিকা উৎপাদন ব্যাহত হয়। তবে সব লিউকিমিয়াতেই যে শ্বেত কণিকার সংখ্যাধিক্যই দেখা যাবে তা নয়। কোন কোন ক্ষেত্রে অ্যালিউকিমিয়া অর্থাৎ শ্বেত কণিকার স্বল্পতা বা সাব-লিউকিমিয়া অর্থাৎ প্রায় স্বাভাবিক সংখ্যার শ্বেত কণিকা দেখা যেতে পারে (যেমন “হেয়ারি সেল লিউকিমিয়া” নামের একটি লিউকিমিয়াতে বহুল ভাবে দেখা যায়)। কাজেই সংখ্যা দিয়ে নয়, রক্তকণিকার অস্বাভাবিকতার ফলেই এই রোগ হয়।

লিউকেমিয়ার প্রকৃত কারণ অজানা।বিভিন্ন লিউকেমিয়ার কারণ বিভিন্ন হতে পারে।বংশগত এবং পরিবেশগত উভয় কারণই এর সাথে সংশ্লিষ্ট হতে পারে। ঝুকির কারণের মধ্যে রয়েছে ধূমপান,তেজস্ক্রিয়তা,কিছু কেমিক্যাল যেমন বেনজিন ইত্যাদি। যেসকল ব্যক্তির লিউকেমিয়ার পারিবারিক ইতিহাস রয়েছে,তারাও উচ্চ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। লিউকেমিয়ার চারটি প্রধান প্রকারভেদ রয়েছে : অ্যাকিউট লিম্ফোব্লাস্টিক লিউকেমিয়া (ALL), অ্যাকিউট মায়েলয়েড লিউকেমিয়া (AML), ক্রনিক লিম্ফোব্লাস্টিক লিউকেমিয়া (CLL) এবং ক্রনিক মায়েলয়েড লিউকেমিয়া (CML)। এটি নিওপ্লাজমের একটি অংশ।

কেমোথেরাপি,তেজস্ক্রিয় থেরাপি,অস্থিমজ্জা স্থানান্তর ইত্যাদির মাধ্যমে চিকিৎসা করা হয়। কিছু লিউকেমিয়া সতর্কতার সাথে পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। লিউকেমিয়ার ধরন এবং আক্রান্ত ব্যক্তির বয়সের উপর চিকিৎসার সাফল্য নির্ভর করে। যুক্তরাষ্ট্রে পাঁচ বছর বেঁচে থাকা রোগীর গড় ৫৭%। লিউকেমিয়ার ধরনের উপর ১৫ বছরের নিচের বাচ্চাদের বেঁচে থাকার গড় ৬০-৮৫% এর বেশি।  যে সকল অ্যাকিউট লিউকেমিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তি পাঁচ বছরের পর ক্যান্সার মুক্ত হয়েছেন,তাদের পুনরায় ক্যান্সারে আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা নেই।

২০১২ সালে বিশ্বব্যাপী ৩,৫২,০০০ ব্যাক্তি লিউকেমিয়ায় আক্রান্ত হয়েছিলেন যার মধ্যে মৃত্যু হয়েছে ২,৬৫,০০০। শিশুদের মধ্যে এটিই সবচেয়ে বেশি হয়ে থাকে,যার মধ্যে তিন চতুর্থাংশের ALL হয়। লিউকেমিয়ায় আক্রান্ত প্রাপ্তবয়স্কদের প্রায় ৯০% চিহ্নিত হোন যার মধ্যে AML এবং CLL প্রধান ।

প্রকারভেদ

চারটি প্রধান লিউকেমিয়া
কোষের ধরন অ্যাকিউট ক্রনিক
লিম্ফোসাইটিক লিউকেমিয়া
(অথবা “লসিকাকোষীয়”)
অ্যাকিউট লিম্ফোব্লাস্টিক লিউকেমিয়া
(ALL)
ক্রনিক লিম্ফোসাইটিক লিউকেমিয়া
(CLL)
মায়েলজেনাস লিউকেমিয়া
(“মায়েলয়েড” বা “অ-লসিকাকোষীয়”)
অ্যাকিউট মায়েলয়েড লিউকেমিয়া
(AML or myeloblastic)
ক্রনিক মায়েলয়েড লিউকেমিয়া
(CML)

লিউকেমিয়ার অনেক প্রকারভেদ আছে। প্রথমটি হল অ্যাকিউট এবং ক্রনিক।

  • অ্যাকিউট লিউকেমিয়া-অপূর্ণাঙ্গ রক্তকণিকার সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি।এর ফলেঅস্থি মজ্জা পূর্ণ রক্তকণিকা উৎপন্ন করতে পারে না। অ্যাকিউট লিউকেমিয়ায় ত্বরিত চিকিৎসা গ্রহণ করা উচিত,কারণ ম্যালিগন্যান্ট কোষের দ্রুত আধিক্য এবং রক্তস্রোতের মাধ্যমে দেহের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়া।এটি শিশুদের লিউকেমিয়ার সবচেয়ে প্রচলিত ধরন।
  • ক্রনিক লিউকেমিয়া-প্রায় পূর্ণাঙ্গ,কিন্তু অস্বাভাবিকশ্বেত রক্তকণিকার সংখ্যা বৃদ্ধি। কোষগুলি স্বাভাবিকের তুলনায় সংখ্যায় অনেক উচ্চহারে উৎপন্ন হতে থাকে,ফলে অস্বাভাবিক শ্বেত রক্তকণিকার সংখ্যা বৃদ্ধি হয়।এমন পর্যায়ে যেতে প্রায় মাস থেকে বছর লেগে যায়।অ্যাকিউট লিউকেমিয়ায় ত্বরিত চিকিৎসা গ্রহণ করলেও ক্রনিক লিউকেমিয়ায় সর্বোচ্চ ফলাফল পেতে পর্যবেক্ষণ করা হয়।অধিকাংশ ক্রনিক লিউকেমিয়া প্রাপ্ত বয়স্কদের হয়।

এর পাশাপাশি কোন ধরনের রক্তকণিকা আক্রান্ত হচ্ছে,তার উপর ভিত্তি করে লিউকেমিয়াকে আরও ভাগ করা হয়,যথা লিম্ফোসাইটিক বা লসিকাকোষীয় লিউকেমিয়া এবং মায়েলজেনাস লিউকেমিয়া।

এই দুইটি প্রকরণকে মিলিয়ে সর্বমোট চারটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়,যাদের উপভাগ রয়েছে।কিছু দুর্লভ লিউকেমিয়াকে অন্য শ্রেণীবিভাগ করা হয়

উপসর্গ

স্বাভাবিক রক্ত উৎপাদন ব্যাহত হবার ফলে নানা রকম রক্তকণিকার অভাবজনিত উপসর্গ দেখা দেখা দেয়- যেমন:

  1. অণুচক্রিকারঅভাবে রক্ত তঞ্চন ব্যাহত হয় ও স্বল্প চোটে রক্তপাত হতে থাকে:
    1. চামড়ার নিচে কালো রক্ত জমা ছোপ দেখা যেতে পারে।
    2. মাড়িফুলে থাকতে পারে।
    3. চোখের সাদা অংশে লাল জমাট বাঁধা রক্ত দেখা যেতে পারে।
  2. শ্বেত রক্ত কণিকারঅভাবে নানা রকম সংক্রামক ব্যাধি হতে পারে:
    1. জ্বর,কাঁপুনিইত্যাদি
    2. নানা জায়গায় পুঁজ যুক্ত ক্ষত হওয়া।
  3. লোহিত রক্তকণিকারঅভাবে রক্তাল্পতা (অ্যানিমিয়া) হতে পারে:
    1. দুর্বলতা, হৃৎকম্প,শ্বাসকষ্টইত্যাদি হতে পারে
  4. যকৃৎও প্লীহা বৃদ্ধি পেতে পারে।
  5. হাড়েচাপ দিলে ব্যাথা অনুভব হতে পারে।

কারণ

লিউকেমিয়া হবার জন্য আলাদা কোন একক কারণ নেই।কিছু জ্ঞাত কারণ ,যা স্বাভাবিক ব্যক্তির আয়ত্তে বড় কোন বিষয় নয়,নিয়ন্ত্রণের বাহিরে গেলে ব্যতিক্রম হতে পারে।লিউকেমিয়ার অধিকাংশ কারণই অজানা।ভিন্ন ভিন্ন লিউকেমিয়ার ভিন্ন ভিন্ন কারণ রয়েছে।

অন্যান্য ক্যান্সারের মতই DNA তে মিউটেশন হলে লিউকেমিয়া হয়।এরকম মিউটেশন ক্যান্সার সক্রিয়কারি এজেন্টকে সক্রিয় করে বা টিউমার দমনকারী জিনকে অক্রিয় করে লিউকেমিয়া করে এবং কোষের স্বাভাবিক প্রক্তিয়া ব্যহত করে।এমন মিউটেশন স্বতঃস্ফুর্তভাবে কিংবা তেজস্ক্রিয় পদার্থের বিকিরণের কারণে হতে পারে।

প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে জানা কারণ প্রাকৃতিক এবং কৃত্তিম তেজস্ক্রিয় পদার্থের বিকিরণ,কিছু ভাইরাস যেমন হিউম্যান T লিম্ফোট্রপিক ভাইরাস ও কিছু কেমিক্যাল,বিশেষ করেবেনজিন উল্লেখযোগ্য।  তামাকের ব্যবহার অ্যাকিউট মায়েলয়েড লিউকেমিয়ার আশঙ্কা বাড়িয়ে দেয়। চুলের ডাই এর ব্যবহার কিছু লিউকেমিয়ার কারণ হতে পারে।

ভাইরাস কিছু লিউকেমিয়ার জন্য দায়ী।ইঁদুর ও অন্যান্য স্তন্যপায়ীদের উপর চালানো পরীক্ষায় লিউকেমিয়ার সাথে রেট্রোভাইরাসের সম্পর্ক দেখা যায় এবং মানব রেট্রোভাইরাস চিহ্নিত করা হয়।প্রথম চিহ্নিত রেট্রোভাইরাস হিউম্যান T লিম্ফোট্রপিক ভাইরাস যা T কোষ লিউকেমিয়ার জন্য দায়ী।

পারিবারিক ইতিহাস থেকে জানা যায় কিছু ব্যক্তির লিউকেমিয়া বংশগত। আক্রান্ত ব্যক্তির এক বা একাধিক জিন একই পাওয়া যায়।কিছু ক্ষেত্রে পরিবারে অন্য সদস্যদের একই লিউকেমিয়া দেখা যায়।অন্যান্য পরিবারে আক্রান্ত ব্যক্তির ভিন্নরকম লিউকেমিয়া হতে পারে।

এসকল জেনেটিক বিষয়ের পাশাপাশি যাদের ক্রোমোসোমে অস্বাভাবিকতা রয়েছে,তাদের লিউকেমিয়ায় আক্রান্ত হবার ঝুঁকি খুব বেশি। উদাহরণস্বরূপ,যাদের ডাউন সিন্ড্রোমআছে,তাদের অ্যাকিউট লিউকেমিয়া হবার সম্ভাবনা বেশি,বিশেষ করে AML।

তেজস্ক্রিয়তা থেকেও লিউকেমিয়া হতে পারে। উচ্চ চৌম্বকীয় ক্ষেত্রে উন্মুক্ত থাকলেও শিশুদের লিউকেমিয়া হতে পারে।

গর্ভাবস্থায় মায়ের লিউকেমিয়া থাকলেও শিশুর হতে পারে।

শনাক্তকরণ

পরিপূর্ণ রক্ত পরীক্ষা এবং অস্থি মজ্জা পরীক্ষার মাধ্যমে লিউকেমিয়া শনাক্ত করা যায়,যদিও কিছু দুর্লভ কেসে রোগীর রক্ত পরীক্ষায় লিউকেমিয়া ধরা পড়ে না,কারণ লিউকেমিয়া প্রাথমিক অবস্থায় থাকে।অন্যান্য লিউকেমিয়া শনাক্ত করতে লসিকা গ্রন্থি বায়োপ্সি করা হয়।

শনাক্তের পর রোগীর উপর প্রয়োগকৃত কেমোথেরাপির প্রভাব যকৃৎ এবং বৃক্ক এর উপর কিরকম হয়,তা জানার জন্য রক্ত পরীক্ষা করা হয়।লিউকেমিয়ার উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হলে চিকিৎসক এক্স রে,MRI,আল্ট্রাসনোগ্রাফি ইত্যাদি পরীক্ষা করতে দিতে পারেন।শেষে,বুকের লসিকা গ্রন্থি পরীক্ষার জন্য সিটি স্ক্যান করা যেতে পারে,তবে তা খুবই কম।

যদিও এসকল পরীক্ষার মাধ্যমে একজন রোগীর লিউকেমিয়া আছে কি না,তা দেখা হয়,তবুও অনেকেই শনাক্ত হোন না।এর কারণ অনেক লক্ষ্মণ অস্পষ্ট,সুনির্দিষ্ট নয় ,যা অন্য রোগের হতে পারে।এজন্যে আমেরিকান ক্যান্সার সোসাইটি মনে করে,কমপক্ষে লিউকেমিয়ায় আক্রান্ত এক-পঞ্চমাংশ শনাক্ত হোন না।

জেনেটিক সিকুয়েন্সিং এর মাধ্যমে জিনে মিউটেশন পরীক্ষা করা হয়।

চিকিৎসা

অধিকাংশ লিউকেমিয়ার চিকিৎসা ঔষধ প্রয়োগের মাধ্যমে হয়,সচরাচর একাধিক ঔষধ ব্যবহার করে।কিছু রোগীর চিকিৎসা কেমোথেরাপির মাধ্যমে করা হয়।আবার কিছু ক্ষেত্রে,অস্থি মজ্জা স্থানান্তর বা bone marrow transplant ফলপ্রসূ।

অ্যাকিউট লিম্ফোব্লাস্টিক

অ্যাকিউট লিম্ফোব্লাস্টিক লিউকিমিয়ার চিকিৎসা অস্থি মজ্জার নিয়ন্ত্রণের উপর জোর দেয়।পাশাপাশি,লিউকেমিয়ায় আক্রান্ত কোষগুলিকে চারদিকে ছড়িয়ে পড়া অবশ্যই রোধ করতে হয়,বিশেষ করে কেন্দ্রীয় স্নায়ু তন্ত্রে(CNS)।সাধারণভাবে,এই চিকিৎসা কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়।

  • কেমোথেরাপি শুরু করা (Induction chemotherapy)
  • থেরাপি একীভূত করা (Consolidation therapy বা intensification therapy)যাতে অবশিষ্ট লিউকেমিয়া কোষ ধ্বংস হয়ে যায়।
  • CNS প্রোফিল্যাক্সিস যাতে লিউকেমিয়া স্নায়ু তন্ত্র এবং মস্তিষ্কে ছড়িয়ে না পড়ে।
  • রক্ষণাবেক্ষণ চিকিৎসা

ক্রনিক লিম্ফোসাইটিক

কখন চিকিৎসা দেওয়া যাবে

সাধারণত যেসব কারণে চিকিৎসা দেওয়া হয়

  • হিমোগ্লোবিন বা অণুচক্রিকার সংখ্যা কমে যাওয়া
  • রোগ আরও বৃদ্ধি পাওয়াProgression to a later stage of disease
  • রোগের কারণে প্লীহা বা লসিকা গ্রন্থির আকার বেড়ে যাওয়া
  • লসিকা কোষ বা লিম্ফোসাইটের অত্যধিক বৃদ্ধি।

চিকিৎসায় অগ্রসর

বর্তমান চিকিৎসা ব্যবস্থায় CLL প্রতিকারযোগ্য নয়।প্রাথমিক চিকিৎসায় ক্লোরামবুসিল বা সাইক্লোফসফামাইডের সাথে কর্টিকোস্টেরয়েড যেমন প্রেডনিসোন সহযোগে কেমোথেরাপি দেওয়া হয়।

অ্যাকিউট মায়েলোজেনাস

বিভিন্ন অ্যান্টি-ক্যান্সার ঔষধ AML এর চিকিৎসার জন্য কার্যকর।AML এর ধরন এবং রোগীর বয়সের তারতম্যের উপর চিকিৎসা নির্ভর করে।এর উদ্দেশ্য হল অস্থি মজ্জা ও দেহের সামগ্রিক রোগ নিয়ন্ত্রণ করা এবং সেই সাথে কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের চিকিৎসা করা।

তথ্যসূত্র

https://bn.wikipedia.org/s/27qp

https://bn.wikipedia.org/wiki/%E0%A6%B2%E0%A6%BF%E0%A6%89%E0%A6%95%E0%A6%BF%E0%A6%AE%E0%A6%BF%E0%A6%AF%E0%A6%BC%E0%A6%BE

Leave a Reply

Need help? e-Mail us here! Chat With Us Now!

← Prev Step

Thanks for contacting us. We'll get back to you as soon as we can.

Please provide a valid name, email, and question.

Powered by LivelyChat
Powered by LivelyChat Delete History